চট্টগ্রাম- বাংলাদেশের বাণিজ্যিক রাজধানী

এটা অনস্বীকার্য যে একটা দেশের কাঙ্খিত আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের দ্রুত প্রসারের জন্য সমুদ্র বন্দর পূবশর্ত যার মাধ্যমেই দেশের মূলতঃ সামগ্রিক আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ঘটে। যে দেশের কোন সমুদ্র বন্দর নেই সেই দেশকে প্রচণ্ড বাধার সম্মুখীন হতে হয় আমদানি-রপ্তানী বাণিজ্যে। বেশিরভাগ বৈদেশিক বাণিজ্যের জন্য তারা পুরোপুরি অন্য দেশের উপর নির্ভরশীল থাকে। প্রকৃতপক্ষে, একটি দেশের সুষম ও টেকসই প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের জন্য সমুদ্র বন্দরের ভূমিকা ও গুরুত্ব অপরিসীম। এটা একটি দেশের অর্থনীতিতে প্রাণশক্তির মত কাজ করে। নেদারল্যান্ড, সিংগাপুর ইত্যাদি দেশগুলো সমুদ্র বন্দরকে সঠিকভাবে কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করেছে। বাংলাদেশও চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দরকে আধুনিকায়নের মাধ্যমে নেদারল্যান্ড ও সিংগাপুরের মত অর্থনৈতিক উন্নয়নে বদ্ধপরিকর। চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দর সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার যোগাযোগ কেন্দে পরিণত হতে পারে।

বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের শতকরা প্রায় ৯০ ভাগ সম্পন্ন হয় চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দর দিয়ে। যার কারণে চট্টগ্রামে গড়ে উঠেছে প্রচুর শিল্প-কারখানা ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। এর মাধ্যমে ত্বরান্বিত হয়েছে হয়েছে দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন। এই অর্থনৈতিক গুরুত্বের কারনেই চট্টগ্রাম দেশের বাণিজ্যিক রাজধানীর মর্যাদা লাভ করেছে।

অর্থনৈতিক গুরুত্ব

চট্টগ্রাম আমাদের দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী এবং এর মধ্য দিয়েই সঞ্চালিত হয় দেশের অর্থনৈতিক জীবনীশক্তি। দেশের সর্বমোট রপ্তানী বাণিজ্যের প্রায় ৭৫ ভাগ সংঘটিত হয় চট্টগ্রামের উপর দিয়ে। অন্যদিকে আমদানি বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এ হার ৮০ ভাগ। রাজস্ব আয়েও চট্টগ্রামের ভুমিকা অপরিসীম। আমাদের মোট রাজস্ব আয়ের শতকরা ৬০ ভাগ আসে চট্টগ্রামের ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে।

এক নজরে অর্থনৈতিক গুরুত্ব

চট্টগ্রামের মাধ্যমে রপ্তানী

:

দেশের মোট রপ্তানী বাণিজ্যের শতকরা ৭৫ ভাগ

চট্টগ্রামের মাধ্যমে আমদানী

:

দেশের মোট আমদানি বাণিজ্যের শতকরা ৮০ ভাগ

রাজস্ব আয়-এ ভূমিকা

:

মোট রাজস্ব আয়ের ৬০ ভাগের বেশী

জিডিপি-তে অবদান

:

১২%

সমুদ্র বন্দর

:

১ টি

আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর

:

১ টি

ইপিজেড

:

৩ টি

গার্মেন্টস

  

শিল্প প্রতিষ্ঠান:

এক নজরে শিল্প প্রতিষ্ঠান

ভারী শিল্প

:

৩২৮ টি

ক্ষুদ্র শিল্প

:

৪৩২৩ টি

উল্লেখযোগ্য শিল্প প্রতিষ্ঠান

:

জাহাজ ভাঙ্গা শিল্প (সীতাকুন্ড), ইস্টার্ন রিফাইনারি, কাফকো, সিইউএফএল, টিএইচপি কমপ্লেক্স, পাহাড়তলি রেলওয়ে ওয়ার্কশপ, যমুনা অয়েল, পিএইচপি ফ্লোট গ্লাস, ইউনিলিভার, গ্ল্যাক্সো প্রভৃতি।

পাটকল

:

২৪ টি

সরকারী বস্ত্রকল

:

৫ টি

সিমেন্ট ফ্যাক্টরী

:

১০ টি

গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল ফ্যাক্টরী

:

৬৪৭ টি

ইপিজেড

:

৩ টি ( সরকারী ১ টি ও বেসরকারী ২ টি)

তেল শোধনাগার

:

১ টি

১০

রাবার বাগান

:

৮ টি

১১

সার কারখানা

:

৩ টি

১২

চা বাগান

:

২৩ টি

১৩

চামড়া শিল্প

:

১৯

১৪

জাহাজ-ভাঙা শিল্প

:

৮০ টি (প্রায়)

১৫

জাহাজ নির্মাণ শিল্প

:

৩০ টি

১৬

বহুজাতিক কোম্পানী

:

১২ টি

১৭

বৈদেশিক কোম্পানী (চট্টগ্রামে অফিস)

:

৬২৮ টি

সরকারী ইপিজেড- চট্টগ্রাম ইপিজেড

বাংলাদেশের প্রথম রপ্তানী প্রক্রিয়াকরন অঞ্চল হিসাবে ১৯৮৩ সালে চট্টগ্রামের হালিশহরে ৪৫৩ একর জায়গার উপর নির্মাণ করা হয় চট্টগ্রাম ইপিজেড। এটা সমুদ্র বন্দর  থেকে ৩.১০ কিলোমিটার এবং শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর থেকে মাত্র ১১.৩০ কিলোমিটার দুরত্বে হওয়ায় শিল্প পার্ক হিসাবে দ্রুত প্রসার লাভ করেছ। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই চট্টগ্রামতথা বাংলাদেশের বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারে চট্টগ্রাম রপ্তানী প্রক্রিয়াকরন অঞ্চল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। সম্প্রতি লন্ডন ভিত্তিক FDI ম্যাগাজিনThe Financial Times এর জরিপে চট্টগ্রাম ইপিজেড বিশ্বের ৭০০ টি ইকোনোমিক জোন এর মধ্যে Cost Effective Zone category-তে তৃতীয় স্থান এবং Best Economic Potential 2010-2011 category-তে চতুর্থ স্থান অধিকার করেছে (FDIম্যাগাজিন- জুন/জুলাই’১০ সংস্করণ)

এক নজরে চট্টগ্রাম ইপিজেড:

অবস্থান

:

দক্ষিণ হালিশহর

প্রতিষ্ঠা

:

১৯৮৩

এরিয়া

:

৪৫৩ একর

প্লটের সংখ্যা

:

৫০১

ফ্যাক্টরী বিল্ডিং

:

৬০,৯১৩ বর্গ মিটার

বিনিয়োগ

:

৭৩০.৪৭ মিলিয়ন ডলার

কর্মসংস্থান

:

১৪০,৬১১

রপ্তানী

:

১০,১৭৮.৩৮ মিলিয়ন ডলার

চালু শিল্পের সংখ্যা

:

১৪৭

নির্মীয়মান শিল্পের সংখ্যা

:

১৯

বেসরকারী ইপিজেড- কর্ণফুলি ইপিজেড

ব্যবসা-অনুকুল পরিবেশ এবং সুবিধাজনক ভৌগলিক অবস্থানের কারনে বেসরকারি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠা করা হয় কর্ণফুলি ইপিজেড। অবস্থানের দিক দিয়ে এই ইপিজেড সবচাইতে অনুকূল এবং ব্যবসা-বান্ধব অবস্থানে অবস্থিত। এটা সমুদ্র বন্দর  থেকে ৬ কিলোমিটার, চট্টগ্রামের ব্যবসা-কেন্দ্র থেকে ১০ কিলোমিটার এবং শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর থেকে মাত্র ১২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।এই কারণে এই ইপিজেড দ্রুত বিকশিত হচ্ছে।

এক নজরে চট্টগ্রাম ইপিজেড:

অবস্থান

:

উত্তর পতেঙ্গা, চট্টগ্রাম

প্রতিষ্ঠা

:

 

এরিয়া

:

২২২.৪২ একর

প্লটের সংখ্যা

:

২৪৬

ফ্যাক্টরী বিল্ডিং

:

২০,০০০ বর্গ মিটার

বিনিয়োগ

:

৫০.৩২ মিলিয়ন ডলার

কর্মসংস্থান

:

৫,৯৩৭

রপ্তানী

:

৪৮.৯৯ মিলিয়ন ডলার

চালু শিল্পের সংখ্যা

:

১৪

নির্মীয়মান শিল্পের সংখ্যা

:

৬০

বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্র, চট্টগ্রাম- বাংলাদেশের নতুন মাইলফলক

বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্র ধারণাটি বহির্বিশ্বে ব্যপক জনপ্রিয়। এটা অনেকটা ওয়ান-স্টপ সার্ভিসের মত যেখানে একই ভবনের ভিতরে সব ধরনের ব্যবসায়িক সুবিধা সরবরাহ করা হয় যার মাধ্যমে একটি দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি ত্বরান্বিত হয়। প্রথম বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হয় যুক্তরাষ্ট্রের নিউ অরলিন্স অঙ্গরাজ্যে ১৯৪৩ সালে। বর্তমান বিশ্বের ১০০ টি দেশে প্রায় ৩০০ টি এরকম বাণিজ্য কেন্দ্র বিদ্যমান।

দি চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স এ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ দেশীয় অর্থনীতির বিকাশে বন্দর নগরী চট্টগ্রামে দেশের প্রথম বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্র হিসাবে ‘বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্র’প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করেছ। এর প্রাথমিক শর্ত হিসাবে The World Trade Center Association (WTCA)  থেকে সদস্য পদ গ্রহণ করেছে দুই লাখ ডলার ব্যয় যা প্রতিবছর নবায়ন করতে হবে দশ হাজার ডলার ফি এর বিনিময়ে। বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্র নির্মিত হবে আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক অঞ্চলে যার নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে ১৪১.৭৩ কোটি টাকা। ২১-তলা বিশিষ্ট ভবনে আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধাই বিদ্যমান থাকবে যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:

Ø  চার তারকা মানের ২৪০ শয্যা বিশিষ্ট বিলাসবহুল হোটেল

Ø  আন্তর্জাতিক মানের কনভেনশন সেন্টার

Ø  অস্থায়ী ও স্থায়ী প্রদর্শনী হল

Ø  আধুনিক মানের অফিস, শপিং মল, কার পার্কিং ইত্যাদি

বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্র, চট্টগ্রাম শুধুমাত্র কর্মসংস্থান, বৈদেশিক বাণিজ্য ইত্যাদিই বৃদ্বি করবে না এর পাশাপাশি স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বৃদ্বিতে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখবে। এছাড়াও বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্র, চট্টগ্রাম স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে এক নতুন মাইলফলক তৈরি করবে এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে একটা নতুন যুগের সূচনা করবে।