এশিয়ার সেরা প্রকৃতিক মৎস্য প্রজনন কেন্দ্র হালদা নদী

এশিয়ার একমাত্র প্রকৃতিক মৎস্য প্রজনন কেন্দ্র হালদা নদী। হালদা বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের একটি নদী। ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য থেকে শুরু হওয়া মৎস প্রজননের জন্য বিশ্বখ্যাত এ নদীটি রামগড় উপজেলার ২নং পাতাছড়া ইউনিয়নের পাহাড়ী ঝর্ণা থেকে নেমে আসা ছড়া সালদাছড়া থেকে উতপত্তি হয়ে ফটিকছড়ির মধ্য দিয়ে চট্টগ্রাম জেলায় প্রবেশ করেছে। দক্ষিণ-পশ্চিম ও পরে দক্ষিণে প্রবাহিত হয়ে ফটিকছড়ির বিবিরহাট, নাজিরহাট, সাত্তারঘাট ও অন্যান্য অংশ হাটহাজারী, রাউজান হয়ে চট্টগ্রাম শহরের কোতোয়ালী থানা হয়ে কালুরঘাট নিকটে কর্ণফুলী নদীতে মিশে গেছে। ৯৮ কিলোমিটার যার মধ্যে ২৯ কিলোমিটার অংশে সারা বছর বড় নৈাকা চলাচল করে থাকে । নদীটির ২৫ থেকে ৫০ ফুট গভীরতার এ নদীতে রুই, কাতলা, মৃগেল, কালিবাউশ প্রভৃতি কার্প জাতীয় মাছের সরাসরি ডিম সংগ্রহ করা হয়। গত শতকের পঞ্চাশ দশকে দেশের মোট মৎস্য চাহিদার ৭০ ভাগ পূরন হয়ে থাকে হালদা নদী থেকে। কিন্তু সঠিক পদক্ষেপের অভাবে মা-মাছ শিকার, নদীর বাঁক কাটা সহ বিভিন্ন কারণে হালদা নদীর ঐতিহ্য প্রায় ধ্বংসের পথে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন হালদা নদীর ৪টি বাঁক কেটে ফেলা, অপরিকল্পিতভাবে সুইচগেট নির্মাণ, মা-মাছ নিধন, হালদা সংলগ্ন এলাকায় অনিয়ন্ত্রিতভাবে শিল্প-কারখানা গড়ে উঠা সহ উত্তর চট্টগ্রামের বিভিন্ন হাট-বাজার, বাসাবাড়ি, কলকারখানার ময়লা-আবর্জনা ও জবাইকৃত পশুর বর্জ্য ফেলার কারণে একদিকে পরিবেশ ধূর্ষণ অন্যদিকে সংঘবদ্ধ চক্রের অবৈধভাবে বালু উত্তোলন, নদীর চর কেটে মাটি উত্তোলন ও দখলের কারণে ঝুকির মুখে পড়ছে নদী কমে যাচ্ছে মাছ ও মাছের প্রজনন । ১৯৪৬ সালের হিসাব অনুযায়ী হালদা নদী থেকে ৪ হাজার কেজি ডিম ১৯৯৭ সালে ৩শ কেজি, ২০০৫ সালে ১শ ৫০ কেজি, ২০০৭ সালে এর পরিমাণ বেড়ে ৩শ ৫০ কেজি ডিম উন্নিত হয়।

অপরএক পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, এ নদী থেকে ২০১০ সালে মাত্র দু’সাপ্তাহেই আয় হয় ৯০০ কোটি টাকা। গত ১০ বছরে এ নদী থেকে রেণু প্রাপ্তির হার প্রতি বছর ৬০৮.৬৪ কেজি। শুধু এ নদী অবলম্বন করে বেঁচে আছে তিন হাজার জেলে আর সাথে জড়িয়ে আছে ২০ হাজার মানুষের জীবন। তথ্যমতে মা কাতলা মাছ হালদায় গত পাঁচ বছরে ডিম ছেড়েছে ১৯কোটি ৫০ হাজার টাকার।

মৎস্য বিশেজ্ঞরা মনে করেন, প্রতিটি ডিম প্রদানের উপযোগী মাছের ওজন ৫কেজি থেকে ১মন পর্যন্ত। হালদা নদীতে মাছের রেণু সংগ্রহ করার প্রধান মৌসুম হল বৈশাখ-জৈষ্ঠ্য মাসের অমাবশ্যা এবং পূর্ণিমার প্রবল বর্ষণ এবং মেঘের গর্জন মহুর্তে। এ সময় মা-মাছ নদীতে ডিম ছাড়ে। তখন নাজিরহাট , সাত্তারঘাট, আজিমারঘাট, বৈদ্যেরহাট, রামদাশ মুন্সীরহাট প্রভৃতি পাশ্ববর্তী এলাকার নৌকা, জাল দিয়ে হালদা নদীর কুলে মাছের রেণু সংগ্রহে জন্য অপেক্ষা করে। মাছ ডিম ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মশারির নেট (বিশেষ ভাবে তৈরি একধরনের জাল) দিয়ে মাছের ডিম নৌকায় তুলে নেয়।

ডিমগুলো নৌকার ভিতরে মধ্যাংশে কাঠের তক্তা ও মাটি দিয়ে তৈরি ছোট কৃত্রিম পুকুরে রেখে দেয়া হয়। এ পুকুরে মিহি সুতার তৈরি জালের আবর্তন থাকে ডিম ধরার পর পাশ্ববর্তী এলাকায় মাটির তৈরি এক ধরনের বিশেষ অগভীর কুয়ায় ডিম ছেড়ে দেয়া হয়। ডিম ফুটানোর জন্য ২/৩ ঘন্টা অন্তর নাড়াচাড়া করতে হয়। এভাবে ১৭/১৮ ঘন্টা পর ডিম থেকে রেণুগুলো জালের পানির নিচে চলে যায়। এ সময় রেণুর রঙ্গ থাকে সাদা। এক পর্যাযে মাছের ছোট রেণুগুলো ভিন্ন কুয়ায় ছেড়ে দেয়া হয়। নতুবা কুয়ার পানি পরিবর্তন করা হয়। রেণুগুলোর স্বাভাবিক বেড়ে উঠার জন্য প্রক্রিয়া অবলম্বন করা হয়। এক সপ্তাহের মধ্যে রেণুগুলো পরিপক্ক হয়ে উঠে। তখন বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা মাছের বেপারীরা নগদমূল্যে মাছের পোনা কিনে নিয়ে যান।

তবে ডিম সংগ্রহকারীরা রেণু উৎপাদনের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। বর্তমানে হালদা নদীর পানি থেকে যে সকল মাছের রেণু সংগ্রহ করা হয় তার মধ্যে ৯০ শতাংশ কাতলা, রুই ও মৃগেল ৯ শতাংশ, কালিবাউশ এবং অন্যান্য মাছের পরিমাণ ১ শতাংশ। ১৫ থেকে ২০ কেজি ওজনের একটি কাতল মাছ একবারে ৪০ লক্ষ ডিম দিতে পারে। ১০ থেকে ১৫ কেজি ওজনের রুই মাছ ২০ লক্ষ ডিম দিতে পারে। ১৯৮৭ সালে চট্টগ্রামের হাটহাজারীর বাড়িঘোনা অংশকে প্রথমবারের মতো সরকারিভাবে অভয়াশ্রম ঘোষণা করা হয়।

মাছের জন্য তখন সারা দেশে ৯টি অভয়াশ্রম ছিল হালদা নদীর মৎস প্রজনন ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে সরকার ২০০৭ সালে হালদা পুররুদ্ধার নামে একটি প্রকল্প নিয়েছে। এর আনুমানিক ব্যায় ধরা হয়েছিলো ১৩ কোটি ৮৪ লাখ ২৫ হাজার টাকা। বর্তমান সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশক্রমে প্রধান মন্ত্রীর কার্যালয়ের মহাপরিচালক (প্রশাসন) কবির বিন আনোয়ার ৩০ এপ্রিল থেকে ০২ মে তিন দিনের সরকারী সফরে হালদা নদীর মৎস প্রজনন ব্যবস্থা বর্তমানে পরিদর্শনে আছেন। হালদা নদীর মাছের প্রজনন ক্ষেত্রের সঙ্গে জড়িত চট্টগ্রামের অসংখ্য নারী-পুরুষের জীবন জীবিকা।

শেয়ার পোস্ট

Share on facebook
Share on google
Share on twitter
Share on linkedin